মওলানা আকরম খাঁর সঙ্গীত ও শিল্পচিন্তা
- Ahmed Din Rumi

- 2 hours ago
- 7 min read
১৯২৮ সাল। কলকাতার মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ বের হলো। প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সমস্যা ও সমাধান’। লেখক মওলানা আকরম খাঁ। সঙ্গীত ও শিল্পকলা মুসলমানের জন্য বৈধ নাকি অবৈধ, সেটা নিয়ে। প্রসঙ্গটা ছিলো তখন রীতিমতো যুদ্ধের ময়দান। একদিকে রক্ষণশীল আলেমরা বলছেন, সঙ্গীত ও ছবি হারাম। এর কাছে যাওয়া মানেই ধর্মের সীমা লঙ্ঘন। অন্যদিকে আধুনিকতাপন্থীরা বলছেন, ইউরোপীয় সভ্যতার সাথে তাল মেলাতে হলে এসব গ্রহণ করতেই হবে। মওলানা আকরম খাঁ দুটো পথের কোনোটাই নিলেন না। তিনি ঢুকে পড়লেন ইসলামি ফিকহের গভীরে। ধ্রুপদি মুসলিম জ্ঞানের সমুদ্র হাতড়ে নির্মাণ করলেন স্বতন্ত্র যুক্তির কাঠামো। ঔপনিবেশিক আমলে সেই নন্দনতাত্ত্বিক বোঝাপড়া নতুন এক দিক উন্মোচন করে দিল।
আকরম খাঁকে বুঝতে হলে তার জীবনটাকে একটু দেখতে হয়। জন্ম ১৮৬৯ সালে, চব্বিশ পরগনার হাকিমপুরে। পাশের গ্রামেই ছিল তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। বাবা মওলানা আবদুল বারী ছিলেন আহমদ শহিদ বেরেলভির অনুসারী। দাদা তোরাব আলি ছিলেন তরিকায়ে মুহম্মদিয়া আন্দোলনের নেতা। সেদিক থেকে পরিবারটাই ছিল ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের দূর্গ।
শৈশবে বাবা-মাকে হারিয়ে আকরম খাঁ প্রতিপালিত হলেন নানার কাছে। পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামে। একে একে রপ্ত করেন কোরআন, গুলিস্তা, বুস্তা। তারপর ধাপে ধাপে শেষ করেন মাদরাসা, জুবেলি হাই স্কুল এবং কলকাতার আলিয়া মাদরাসার পড়াশোনা। ছাত্রবস্থাতেই মাথায় জ্বলে উঠল জাতীয় চেতনার আগুন। ইংরেজ শাসকের প্রতি অনীহা ছিল স্পষ্ট, কিন্তু যুগের বাতাস পড়তে তাঁর জুড়ি ছিল না। পড়াশোনা শেষ করে তাই সাংবাদিকতায় ঝুঁকলেন পাকাপাকিভাবে। ১৯১০ সালে মুহম্মদী পত্রিকা চালু করলেন। তারপর একে একে নেতৃত্ব দিতে থাকলেন যামানা, সেবক, মাসিক মোহাম্মদী ও আজাদের মতো পত্রিকার। রাজনীতিতেও ছিলেন সমান সরব। খেলাফত আন্দোলন, বেঙ্গল প্যাক্ট, নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি ও মুসলিম লিগের সভাপতিত্ব তার রাজনৈতিক লড়াইয়ের সরব বাঁক। ১৯৬৮ সালে ৯৯ বছর বয়সে এই কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষটির মৃত্যু হয়।
বিভক্ত সমাজ, সংস্কারের প্রশ্ন
ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলিম সমাজ তখন অদ্ভুত এক চাপের মুখে ছিল। ব্রিটিশ শাসন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। হিন্দু নবজাগরণ বাঙালি সংস্কৃতিকে ক্রমশ হিন্দু মধ্যবিত্তের নান্দনিকতার সমার্থক করে তুলছে। রবীন্দ্রনাথ-দ্বিজেন্দ্রনাথের হাতে সঙ্গীত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। শান্তিনিকেতন ও কলকাতাকেন্দ্রিক বঙ্গীয় চিত্রকলা উচ্চতার নতুন মাপকাঠি তৈরি করছে। আর ভেতর থেকে? রক্ষণশীল আলেমরা বলছেন, এসব হলো ‘অপরের সংস্কৃতি’। মুসলমানের এসব থেকে দূরে থাকাই ধর্মীয় শুদ্ধতা। গ্রামোফোন, পাবলিক কনসার্ট ও থিয়েটার হলো ফেতনা। এই বহুমুখী চাপে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সামনে তখন মোটাদাগে দুটো পথ: হয় পশ্চিমা আলোকায়নের যুক্তিতে সঙ্গীত ও শিল্পকে গ্রহণ করে নিতে হবে ইসলামকে পেছনে রেখে। নয়তো রক্ষণশীলতার খোলসে নিজেকে গুটিয়ে নাও। কিন্তু মওলানা আকরম খাঁ বললেন, তৃতীয় একটি পথ আছে। তিনি ধর্মের ভেতর থেকেই সঙ্গীত ও শিল্পকলার নজির হাজির করলেন। তারপর বললেন, যা অচল তা ইসলাম নয়, যা ইসলাম তা অচল নয়। তার এই সমালোচনাকে ‘রিলিজিয়ন অ্যাজ ক্রিটিক’ গ্রন্থের বয়ানে পাঠ করা যেতে পারে, যেখানে রক্ষণশীলতার ক্রিটিক করেছে খোদ ধর্ম।
প্রমাণের ভার কার উপর?
আকরম খাঁ শুরু করলেন একটি ফিকহি নীতি দিয়ে। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এটি পরিচিত ‘আল-আসল ফিল আশইয়া আল-ইবাহা’ নামে। সারকথা হলো: পৃথিবীর সবকিছু প্রকৃতিগতভাবে বৈধ, যতক্ষণ না নির্দিষ্ট দলিলে তা অবৈধ প্রমাণিত হয়। কোরআনেই বলা আছে, আল্লাহ পৃথিবীর সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ইমাম শাফেয়ি তাঁর আল-রিসালায়, ইমাম গাজালি তাঁর মুসতাসফায় এই নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হানাফি আলেমরা একে বলেছেন ‘আল-বারাআ আল-আসলিয়াহ’, তার মানে কোনো বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না আসা পর্যন্ত তা নিষেধমুক্ত।
এই নীতি প্রয়োগ করে আকরম খাঁ একটি বৈপ্লবিক বিষয়ের আনজাম দিলেন। তিনি প্রমাণের ভার উল্টে দিলেন। তিনি বললেন, সঙ্গীত বা চিত্রকলা বৈধ কিনা তা প্রমাণ করার দায় আমার নয়। যারা এগুলোকে হারাম বলতে চান, দলিল হাজির করার দায় তাদের। সাংস্কৃতিক চর্চা মানবিক অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক অংশ। সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখার আগে কারণ দেখাতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সংস্কৃতির ভিত্তিটাকেই তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। স্বপক্ষের প্রমাণ হিসেবে তার কাছে এতটুকুই যথেষ্ট; তবে আকরম খাঁ আরো এগিয়ে গেছেন।
সঙ্গীত: আলেমদের কঠোরতা আপেক্ষিক
সঙ্গীতের প্রশ্নে রক্ষণশীল আলেমদের অবস্থানকে আকরম খাঁ সরাসরি ভুল বললেন না। বরং তিনি সেই অবস্থানকে স্থাপন করলেন ইতিহাসের ক্যানভাসে। তাঁর যুক্তি: উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে দরবারি সংস্কৃতিতে সঙ্গীতের অশালীন ব্যবহার হচ্ছিল। চরমপন্থী সুফিরা সঙ্গীতানুষ্ঠানকে ইবাদতের মর্যাদা দিচ্ছিলেন। সে পরিস্থিতিতে আলেমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এটা ছিল সমকালীন বিপদ ঠেকানোর ইজতেহাদ, সর্বকালীন বিধান নয়।
তাঁর ভাষায়, ‘সমসাময়িক যুগের ব্যভিচার ও সীমালঙ্ঘনের প্রতি লক্ষ্য করিয়া অবস্থাগতিকে বৃহত্তর অমঙ্গলের গতিরোধকরার সাধু উদ্দেশ্যেই তাহারা ওই প্রকার ব্যবস্থা প্রদান করতে বাধ্য হইয়াছিলেন।’ এই বিশ্লেষণে আকরম খাঁ বলছেন না পূর্ববর্তী আলেমরা ভুল ছিলেন। বলছেন তাঁরা তাঁদের পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিস্থিতি এবং বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। ফলে সেই ইজতেহাদকে চিরকালীন বিধান হিসেবে প্রয়োগ করা আসলে সেই আলেমদের নিজস্ব পদ্ধতিরই লঙ্ঘন। এভাবে রক্ষণশীল অবস্থানকে খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি সেই অবস্থানের নিজস্ব যুক্তিকাঠামোকেই ব্যবহার করলেন।
কোরআন: ভাষার ভেতরে যুদ্ধ
সঙ্গীতবিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল ইমাম ইবনে জাওজির ‘তালবিসে ইবলিস’। তিনি তিনটি কোরআনিক আয়াত থেকে সঙ্গীতের বিরুদ্ধে যুক্তি গড়েছিলেন। আকরম খাঁ সেই তিনটি আয়াতই পুনর্পাঠ করলেন।
প্রথম আয়াত সূরা লুকমানের। জাওজি ‘লাহওয়াল হাদিস’ শব্দগুচ্ছের অর্থ করেছিলেন সঙ্গীত। আকরম খাঁ দেখালেন ‘লাহওয়া’ শব্দের মূল অর্থ হাসি-তামাশা বা বেহুদা কথা, সঙ্গীত নয়। তাহলে এই আয়াতের মানে দাঁড়ায়: যেকোনো মাধ্যম যদি মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে, তা নিন্দনীয়। সেটা গানই হোক, কিংবা কবিতা বা ওয়াজ কিংবা কথা। তার মানে অনেক ওয়াজ ও ধর্মীয় বক্তৃতাও যদি মানুষকে বিপথে নেয়, তাহলে সেগুলোও এই আয়াতের আওতায় পড়ে।
দ্বিতীয় আয়াত সূরা নাজমের। জাওজি ‘ছামেদুন’ শব্দের অর্থ করেছিলেন সঙ্গীতকারী। আকরম খাঁ দেখালেন আরবি ভাষায় ‘ছামেদ’ শব্দের প্রতিষ্ঠিত অর্থ গাফেল বা উদাসীন। হযরত আলির (রা.) একটি ঘটনা টেনে এবং আয়াতের প্রসঙ্গ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখালেন এখানে কেয়ামতের প্রতি উদাসীনতার কথা বলা হচ্ছে, সঙ্গীতকারীর নয়।
তৃতীয় আয়াত সূরা বনি ইসরাইলের। জাওজি বলেছিলেন শয়তানের ‘ছাওত’ বা শব্দই সঙ্গীত। আকরম খাঁ কোরআন থেকেই পাল্টা দলিল টানলেন: সূরা হুজুরাতে বলা হয়েছে নবীর ‘ছাওত’-এর চেয়ে নিজের ‘ছাওত’ উঁচু না করতে। সূরা লুকমানে বলা হয়েছে সবচেয়ে ঘৃণিত ‘ছাওত’ হলো গাধার। এই দুই জায়গায় ‘ছাওত’ যদি সঙ্গীত অর্থে ব্যবহৃত হতো, তাহলে বাক্যের কোনো অর্থই দাঁড়াত না। পদ্ধতিটা লক্ষ করার মতো। আকরম খাঁ কোরআনকে কোরআন দিয়েই পাঠ করেছেন।
ঐতিহ্যের মধ্যেই বিপক্ষ মত
নিষেধাজ্ঞার দলিলগুলো খণ্ডন করার পর আকরম খাঁ ইতিবাচক প্রমাণের দিকে মনোযোগ দিলেন। চার স্তরে তিনি সঙ্গীতের ধর্মীয় অনুমোদন প্রতিষ্ঠা করলেন। প্রথম স্তরে রাসুল নিজে। শুধু সঙ্গীত শ্রবণ নয়, তিনি অনুমতি ও আদেশও দিয়েছেন। দ্বিতীয় স্তরে সাহাবিরা, যাঁরা সঙ্গীতচর্চা করতেন। তৃতীয় স্তরে ইমাম মালিক, শাফেয়ি ও আবু হানিফার ইজতেহাদ। বিশেষভাবে ইমাম মালিক নিজেই ছিলেন সঙ্গীত বিশারদ। আকরম খাঁর কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যেখানে গভীর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও সঙ্গীতচর্চা পরস্পরবিরোধী নয়।
চতুর্থ স্তরে বিশাল একটি ধ্রুপদি জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারা; যেখানে ইবনে হাজম, কাজি ইসা, ইবনুল আরবি, ইমাম মাওয়ার্দি, আবু তালেব মক্কি, ইমাম গাজালি থেকে শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি পর্যন্ত শত শত মুহাদ্দেস নির্দোষ সঙ্গীতকে বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। এই তথ্যগুলো একত্রিত করে আকরম খাঁ একটি বড় দাবি করলেন: সঙ্গীতবিরোধী অবস্থান আসলে ইসলামি ঐতিহ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মত নয়, বরং একটি সংখ্যালঘু অবস্থান। নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে প্রাধান্য পেয়েছিল।
চিত্রকলা: আরও জটিল লড়াই
সঙ্গীতের চেয়ে চিত্রকলার প্রশ্নে লড়াইটা কঠিন ছিল। কারণ হাদিসে মুসাওয়ির বা ছবিনির্মাতাদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা আছে এবং এই বর্ণনাগুলোর সূত্রগত মান নিয়ে তেমন বিতর্ক ছিল না। আকরম খাঁকে তাই ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। সেটা হলো, নিষেধাজ্ঞার অস্তিত্ব অস্বীকার না করে তার কারণ ও প্রয়োগসীমা নির্ধারণ করা।
তিনি ইসলামি আইনের ‘তাদরিজ’ বা বিধানের ক্রমিক বিকাশের নীতিকে সামনে আনেন। ইসলামের বিধানাবলি একসাথে নাজিল হয়নি, ধীরে ধীরে কার্যকর হয়েছে। মদ হারাম হওয়ার পর প্রথমে মদের পাত্রও হারাম ছিল। কিন্তু যখন মদপানের অভ্যাস উঠে গেল, পাত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলো। কবর জিয়ারত প্রথমে নিষিদ্ধ ছিল পৌত্তলিকতার আশঙ্কায়, পরে সেই আশঙ্কা কমায় অনুমতি মিলল। এই উদাহরণ থেকে তিনি একটি নীতি হাজির করলেন। ইসলামি বিধানে নিষেধাজ্ঞা প্রায়শই কোনো বস্তুর বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে। সেই ঝুঁকি যখন কমে যায়, বিধানও পরিবর্তিত হয়।
চিত্রকলার ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি ছিল মূর্তিপূজা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরব সমাজে পৌত্তলিকতার যে প্রবল উপস্থিতি ছিল, সে প্রেক্ষাপটে চিত্রকলার নিষেধাজ্ঞা ছিল শিরকের বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। ইসলামি আইনশাস্ত্রের পরিভাষায় এটি ক্ষতির পথ রোধ করার নীতি। কিন্তু সেই পথটি আর সক্রিয় না থাকলে সুরক্ষামূলক নিষেধাজ্ঞারও অপরিবর্তিত থাকার কারণ নেই।
হাদিসের ভেতরে হাদিস
চিত্রকলাবিরোধী সবচেয়ে প্রচলিত হাদিসটি হলো হযরত আয়েশার ঘরের পর্দা প্রসঙ্গে। রাসুল একবার পাখির ছবি আঁকা পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। এই বর্ণনাটি সাধারণত জীবন্ত সত্তার চিত্রকলার বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আকরম খাঁ অন্য একটি বর্ণনার আলোকে বলেন, রাসুল ওই পর্দার দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন এবং পর্দার ছবি নামাজের একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। অর্থাৎ পর্দা ছেঁড়ার কারণ চিত্রকলার বিরোধিতা নয়, নামাজের মনোযোগ রক্ষা।
এই ব্যাখ্যার পক্ষে আরও শক্তিশালী দলিল আসে একই ঘটনার পরবর্তী অংশ থেকে। সেই পর্দা দিয়েই পরে বালিশ ও গদি বানানো হয়েছিল এবং রাসুল সেগুলোতে শয়ন করেছিলেন কোনো আপত্তি ছাড়াই। যদি ছবি নিজেই হারাম হতো, তাহলে ছবিযুক্ত কাপড়ের বালিশে শয়ন করা সম্ভব হতো না। এই পুরো বর্ণনার একমাত্র সূত্র আয়েশা নিজে, যিনি একই সাথে পর্দা ছেঁড়ার সাক্ষী এবং সেই কাপড়ে বালিশ বানানোর কাজটিও করেছিলেন। দুটি বর্ণনা পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ চিত্র উপস্থাপন করে।
বৈধতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে তিনি হাজির করলেন রাসুলের ঘরে আয়েশার পুতুল রাখার ঘটনা। রাসুল জানতেন, কিন্তু কখনো নিষেধ করেননি। পুতুল হলো ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতি। যদি ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতি রাসুলের উপস্থিতিতে বৈধ হয়, তাহলে চিত্রকলার বিরুদ্ধে সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞার যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ঐতিহ্যের ভেতর থেকে সমালোচনা
নৃবিজ্ঞানী ইরফান আহমেদ তাঁর ‘Religion as Critique’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে সমালোচনা এসেছে ধর্মের ভেতর থেকেই। ইউরোপে ধর্ম ও সমালোচনা পরস্পর বিরোধাত্মক হয়ে উঠেছিল। মুসলিম ইতিহাসে তা ঘটেনি। আকরম খাঁর কাজ এই পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রমাণ।
তিনি রাসুলের কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে রক্ষণশীল অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ইমাম মালিকের সঙ্গীতপ্রীতি দিয়ে সঙ্গীতবিরোধী ফতোয়াকে আপেক্ষিক করেছেন। কোরআনের আয়াত দিয়ে কোরআনের প্রচলিত তাফসিরকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে সমালোচনার হাতিয়ার ঐতিহ্যের বাইরে থেকে আসেনি। ঐতিহ্য নিজেই সেই হাতিয়ার সরবরাহ করেছে।
তালাল আসাদের ভাষায় বলতে গেলে, আধুনিকতা কোনো একরৈখিক বা সার্বজনীন প্রক্রিয়া নয়। আকরম খাঁ পশ্চিমা কাঠামোয় নিজেদের পুনর্গঠন করা কিংবা সেই কাঠামোকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার পথে না গিয়ে তৃতীয় একটি সম্ভাবনা দেখিয়েছেন: ক্লাসিক্যাল ফিকহের পরিভাষা ও যুক্তিকাঠামো ব্যবহার করে আধুনিকতার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া।
নন্দনতত্ত্বের সংহত কাঠামো
সঙ্গীত ও চিত্রকলার প্রশ্নে আকরম খাঁর যুক্তিগুলো আলাদাভাবে পড়লে মনে হয় দুটি ভিন্ন বিষয়ে দুটি আলাদা ফিকহি বিতর্ক। একসাথে পড়লে দেখা মেলে একটি সুসংহত বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলের। উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণের ভার নিষেধাজ্ঞাবাদীদের উপর দেওয়া হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রচলিত দলিলের ব্যাখ্যাকে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাসুল ও সাহাবিদের আচরণ থেকে বৈধতার ইতিবাচক ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে।
এই অভিন্ন পদ্ধতির পেছনে একটি অভিন্ন দর্শন: শিল্পকলা মানবিক অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক অংশ এবং ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরেই এর ন্যায্যতা প্রমাণ করা সম্ভব। তবে আকরম খাঁ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি সমস্ত গান ও সকল চিত্রকলাকে বৈধ বলছেন না। যে সঙ্গীত অশ্লীল এবং যে চিত্রকলা অশালীন তা নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নিষিদ্ধতা সেগুলো গান ও চিত্রকলা হওয়ার কারণে নয়। অশ্লীল ও অশালীন হওয়ার কারণে। ফিকহের পরিভাষায় এটি তাগাইয়ারুল আহকাম বি তাগাইয়ারিল আজমান ওয়াল আমকান তথা সময় ও স্থানের পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন। এভাবে ফিকহ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হলো একটি নন্দনতাত্ত্বিক কাঠামোতে।
সাংস্কৃতিক আত্মনির্ভরতার প্রকল্প
আকরম খাঁর সঙ্গীত ও শিল্পচিন্তাকে শুধু ফিকহি মতামত হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এটি আসলে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ। ঔপনিবেশিক বাংলায় ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ ধীরে ধীরে হিন্দু মধ্যবিত্তের নান্দনিকতার সমার্থক হয়ে উঠছিল। মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সামনে প্রশ্ন ছিল: তারা কি এই উদীয়মান সাংস্কৃতিক ধারার অংশ হবেন নিজেদের মিলিয়ে দিয়ে, নাকি স্বতন্ত্র মুসলিম সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করবেন?
আকরম খাঁ চেয়েছিলেন স্বতন্ত্র পরিচয়। তবে রক্ষণশীলতার খোলসে গুটিয়ে নয়। তাঁর কাছে শিল্পকলার বৈধতা প্রমাণ করা তাই কেবল ফিকহি প্রশ্ন ছিল না, ছিল মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মনির্ভরতার প্রশ্নও। মুসলিম সমাজ যদি শিল্পকলা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখে, তাহলে সাংস্কৃতিক পরিসরটি অন্যদের দখলে চলে যাবে। ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতর থেকে শিল্পকলার ন্যায্যতা প্রমাণ করা তাই একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক অবস্থান নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এজন্যই তার বক্তব্য ছিলো সহজ, ‘যা ইসলাম তা অচল নয়; যা অচল তা ইসলাম নয়’। আখতার-উল-আলম যথার্থই লিখেছেন, ‘আজ বাংলার মুসলিম সমাজ যে আধুনিক যুক্তিবাদী চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্যবিধান করে এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলতে পারছে — মওলানা সাহেবই ছিলেন তার প্রথম পথিকৃৎ।’
Comments